তিনি বর্তমানে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত। ৭ আগস্ট মা রেহানার সঙ্গে হাসিমুখের ছবিসহ ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন হোচিমিন। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘চরম চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমার মা এসেছিলেন আমার বাড়িতে, বসেছিলেন আমার পাশে, ঢাকার রাস্তায় হেঁটেছিলেন আমার সঙ্গে! এ দেশের একজন ট্রান্সজেন্ডার কন্যা হিসেবে এর চেয়ে বড় সাফল্য আমি আর কিছুই দেখি না!’ হিজড়া-ট্রান্সজেন্ডার সন্তান নিয়ে খোদ পরিবারের মধ্যেই ‘ট্যাবু’ আছে। এই থেকে ‘ট্যাবু’ থেকে বেরিয়ে এসেছেন হোচিমিনের মা রেহানা।
তিনি একসময় হোচিমিনকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে আবার কাছে টেনে নিয়েছেন। পোস্টে হোচিমিন তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন—ট্রান্সজেন্ডার মানে, হিজড়া মানে—বাড়ি থেকে, মায়ের কোল থেকে বিতাড়িত! লম্বা একটা সময় ছিল, মায়ের সঙ্গে তাঁর কথা হতো না। কোনোরকম যোগাযোগও হতো না। তিনি তখন সবকিছু থেকে বিতাড়িত। পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়, স্বজন—সবকিছু থেকে। পাড়ার লোকেরা তাঁর সহজ-সরল মায়ের, বোনের জীবন অতিষ্ঠ করে ছেড়েছিল। তাঁর মা বাড়ি থেকে বের হতেন না। কান্না করে দিন পার করতেন। দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতেন।
হোচিমিন লিখেছেন, লজ্জায়, অসম্মানে ঘরবন্দী মা-বোন এক দিন ঘুরে দাঁড়ান। তাঁর মা পাড়ার লোকেদের মুখে ওপর বলে দেন, ‘ওটাই আমার সন্তান। ওকেই আমি পেটে ধরেছি।’ হোচিমিন লিখেছেন, ‘কত কত দিন শেষ বিকেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতাম, কোনো দিন কি পারব আমি আমার মায়ের কোলে ফিরে যেতে? পারব কি মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর কন্যার মর্যাদা নিয়ে ছবি তুলতে? চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ত জল! দীর্ঘ নিশ্বাসকে সঙ্গী করে সরিয়ে নিতাম চিন্তাগুলো।’ হোচিমিনের প্রত্যাশা, অন্য হিজড়া-ট্রান্সজেন্ডারদের মা–বাবারাও তাঁদের সন্তানদের বুকে টেনে নিক। পরিবারগুলো তাঁদের ডেকে নিক।
হোচিমিন লিখেছেন, ‘সন্তান তো সন্তানই, সে যেটাই হোক তাঁর জেন্ডার। মা, বাবা, বোন, ভাইদের কাছে জেন্ডার সম্পর্কের বাধা হয়ে না দাঁড়াক। সমাজ বদলে যাক।’ হোচিমিনের মতে, ট্রান্সজেন্ডার একটি সামাজিক শব্দ। সামাজিক প্রক্রিয়া ও চিকিৎসাবিদ্যার মিশেলে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ নামে নতুন একটি মানুষের জন্ম হয়। এ ক্ষেত্রে আসলে ব্যক্তি নিজেকে কোনো পরিচয়ে পরিচিত করতে চান, সেটাই বড় কথা।
হোচিমিন বলেন, তাঁর মা ঢাকায় তাঁর বাসায় এসে রান্না করেন। বাইরে হাঁটতে যান। খেতে যান। হাসিমুখে ছবি তোলেন। বাড়ির মালিকসহ আশপাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সঙ্গে গল্প করেন। হোচিমিনকে নিয়ে তাঁর মায়ের একসময় নেতিবাচক ধারণা ছিল। এ প্রসঙ্গে হোচিমিন বলেন, ‘মা ভেবেছিলেন, আমার বাসা, স্বাভাবিক জীবনযাপন বলে কিছু থাকবে না। তবে আমার বাসায় এসে মা দেখেন, সব গোছানো।
আমি পড়াশোনা করেছি। এখন চাকরি করছি। সবই আমি করছি।’ মুঠোফোনে হোচিমিনের মা রেহানা বলেন, ঢাকায় মেয়ের বাসায় এসে তাঁর অনেক ভালো লেগেছে। তিনি আবার আসবেন। তাঁর অপর মেয়ে ও মেয়ের স্বামী হোচিমিনকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন। তাঁকে আগলে রাখছেন। ২০১৮ সালে হোচিমিন বগুড়া থেকে ঢাকায় আসেন। ২০১৯ সালের শেষে দিকে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ে পরিচিত হওয়া শুরু করেন।
২০২১ সালের মাঝামাঝি হোচিমিন প্রথম শাড়ি পরে নিজের পরিচয়ে বাড়ি গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করেন। তারপর মা ঢাকায় তাঁর বাসায় দুবার এসেছেন। হোচিমিন জানান, তিনি যখন নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে ঘোষণা দেন, তখন তাঁর পরিবারকে একঘরে করে রাখা হয়। তাঁর পরিবারকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। কেউ কেউ সম্পত্তি দখলের পাঁয়তারা করে। এসব কারণে মাসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপ হয়।
তবে তিনি দমে যাননি। পুলিশ, সাংবাদিক, বন্ধুদের সমর্থনে প্রতিবাদ করেন। প্রতিবাদের মুখে হয়রানিকারী ব্যক্তিরা পিছু হটে। ধীরে ধীরে মাসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো হতে থাকে। হোচিমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেসবুকে মায়ের সঙ্গে ছবি পোস্ট দেওয়া নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। ভাবছিলাম, এ ছবি দিলে লোকজন আবার উল্টোপাল্টা কিছু বলে কি না। পরে মনে হলো, আমার মা আমার কাছে এসেছেন। তিনি আমাকে মেনে নিয়েছেন। সবার কাছে তিনি গর্ব নিয়েই তা বলছেন। তো মা-মেয়ের ছবি দিতে সমস্যা কি! মা-মেয়ের এই স্বাভাবিক সম্পর্ক সবাইকে জানানো দরকার।
No comments:
Post a Comment